দর্শক: “নাটক দেখে ফিরিয়ে দিচ্ছে, কুড়িয়ে পাওয়া সব”

853

মহসিনা ফেরদৌস: একটি কুড়িয়ে পাওয়া মানিব্যাগের ভেতরে যে, চরিত্র বসবাস করে তা ঠিক টের পায় রানা। এমনটা হয়েছে সে একজন আলসে ছেলে হিসেবে। শ্রাবন্তী নামের মেয়েটির সঙ্গে তিনবছর ধরে ভালোবাসার সম্পর্ক। তবে রানা তাকে পেয়েছে অনেক কষ্টে-কান্নার পর। শর্ত ছিল অনেক গুলো। কিন্তু রানা পড়াশোনা শেষ করেও প্রেমের সেই শর্ত কোনটাই রাখতে পারেনি। শুধু ভালোবাসাটা ছাড়া। মফস্বল শহর থেকে ঢাকায় এসে রানা বুঝতে পারেনি প্রেমিকা ও পরিবার একসঙ্গে চালাতে হলে প্রয়োজন হবে একটি মানিব্যাগের। যেটা ভর্তি শুধু থাকবে টাকা। এমনটা সবাই চায়, শুধু নাটকের চরিত্র রানা নয় কিংবা প্রেমিকারা আসলে ঠিক এমন করেই প্রেমিকদের পেতে চায়। বারবার আলসেমি করে রানা ইন্টারভিও গুলো মিস করতে থাকে। যার জন্য শ্রাবন্তী অনেক বিরক্ত রানার উপর। তাই রানা’র সঙ্গে ঝগড়া করে যে যার মতো চলে যায় সেদিন।

বাসায় ফেরার পথে একটি মানিব্যাগ কুড়িয়ে পায় রানা। তার মধ্যে ২৫ হাজার টাকা। শতকথা শুনে রানা লোভ সামলাতে পারে না। ভেতরে থাকা কাগজ পত্র সব ফেলে দিয়ে রাস্তায়, টাকা ভাঙতে শুরু করে এবং এক দিনেই ভাঙা শেষ। পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা পাঠিয়ে খরচ বাবদ ১০ হাজার টাকা রেখে দেয়। নিজের জন্য রাখা টাকা থেকে শ্রাবান্তীকে কিনে দেয় গলার চেইন। শ্রাবন্তীর কৌতুহলী মনের নানান প্রশ্নে রানা’র মিথ্যে উত্তর। অনলাইন বিজনেস করে রানা ২৫ হাজার টাকা কমিশন পেয়েছে। এই বিজনেসটা রানা এখন থেকে নিয়মিত করবে। শ্রাবন্তী অনেকটা থমকে গেলেও শেষমেষ রানা’র কথা বিশ্বাস করে নেয়। কিন্তু রানা যখনই চেইনটা প্রেমিকার গলায় পরাতে যায়, তখনই তৃতীয় একজন মানুষকে অনূভব করে। একটি ছায়া তার সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যায়। রানা কিছুটা চমকে গেলেও গলায় চেইনটি পরিয়ে দেয়। এই আনন্দে কিছুটা আবার নতুন করে প্রেমে পড়ে তারা।

হাসিখুশি রানা ফিরে এসে ঘুমিয়ে পড়ে নিজের বিছানায়। তার স্বপ্নে আসে শাকিল নামের রহস্যজনক এক ব্যক্তি। শাকিলের দাবী মানিব্যাগটি তার। সে তার টাকা ফেরত চায়। রানা তাকে দেখে ভয় পায় এবং সব কথাই অস্বীকার করে তিরষ্কার করে। স্বপ্ন ভাঙে রানা’র শাকিলকে ঝাড়ি মারতে মারতে। গলা শুকিয়ে যায় রানা’র। সে শুধু এখন শাকিলকেই দেখতে পাচ্ছে সামনে। শাকিলও বারবার বলছে তার টাকা ফিরিয়ে দিতে। এভাবে কিছুদিন যেতে না যেতেই রানা’র মধ্যে এক অদ্ভুত অনুশোচনায় ভুগতে শুরু করে। যার নাম বিবেক। ফলে, শাকিলকে সে বারবার দেখতে পাচ্ছে। রানা’র মানসিক অবস্থা ধীরে ধীরে নৈতিবাচক বিবেকের ইতিবাচক রূপ লাভ করে। তাই মানিব্যাগের আসল মালিক শাকিলকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়ায়। তখনও অবশ্য রানা জানে না যে, স্বপ্নে আসা মানুষটিই হচ্ছে মানিব্যাগটা’র মালিক। তাই সে বারবার নিজেকে প্রশ্ন করতে থাকে মানিব্যাগটা কার?

এভাবে দিশেহারা হয়ে রানা খুঁজতে থাকে ঠিক যেখানে মানিব্যাগটার কাগজপত্র ফেলেছিল সেখানে। পাচ্ছে না কোন কাগজপত্র। এতদিন এই শহরে ময়লা রাস্তায় থাকে না। শাকিল নামক মানুষটির যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে অবশেষে খুঁজে পায় ছবির পেছনে থাকা ফটোকপির নাম্বারযুক্ত একটি ছবি। এটা নিয়ে খুঁজতে থাকে নানান ছবি তোলার স্টুডিওতে। এতসব খোঁজার মাঝে রানা এই মানসিক বিপর্যস্থ অবস্থায় ফোন ধরতে পারে না শ্রাবন্তীর। তাই শ্রাবন্তী নিজেই খুঁজে বের করে রানাকে। ফোন না ধরার কারণ জানতে। রানার বিবেক এবার সঠিক রূপে শ্রাবন্ত্রীর সামনে হাজির হয়। নিজের দোষ স্বীকার করে নিয়ে রানা’র অনুশোচনার আবেগ, কান্নার মাধ্যমে প্রকাশ পায় শ্রাবন্তীর কাছে। শ্রাবন্তীও প্রমাণ করে দেয় যে, সে মন থেকেই ভালোবাসে রানাকে। অনুশোচনায় রানাকে দেখে শ্রাবন্তী সাপোর্ট দেয়।

রানা’র কাছ থেকে সব শুনে শ্রাবন্তী জানায় থানায় পুলিশের সঙ্গে কথা বলার জন্য। এতে খুঁজে পাওয়া সহজ হবে। প্রেমিকার সার্পোটে রানা এবার পুলিশের কাছে। ছবি দেখিয়ে সে জানতে পারে শাকিল সড়ক দুর্ঘনায় মারা গেছে। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও লাশের পরিচয় জানতে পারেনি পুলিশ। তাই আন্জুমান মফিদুল ইসলামে দিয়ে দাফন করে ফেলেছে। পুলিশের সান্ত্বনা নিয়ে রানা চলে আসে ঠিকই কিন্তু তার ভেতরে আরও বেশি অনুশোচনা কাজ করে। তাই সে নিজে থেকে আবারও খোঁজা শুরু করে স্টুডিও গুলোতে। একপর্যায়ে জানতে পারে শাকিল নামের ছবির ছেলেটি কোন বাসায় থাকে। সেখানে যায় রানা। গিয়ে আরও অবাক হয়। শাকিলের রুমমেট ও বাড়িওয়ালা খুঁজে পাচ্ছে না তাকে। অবশ্য বাড়িওয়ালা থেকে গ্রামের ঠিকানা পেয়ে যায় রানা।

গ্রামের বাড়িতে গিয়ে রানা এবার মুখোমুখি বিবেকের বাস্তবতার সঙ্গে। যেখানে রয়েছে শাকিলের অসুস্থ মা, অন্ধ বাবা আর অন্তঃসত্বা স্ত্রী। শাকিলের পরিবারের কেউ কিছু এখনও টের পায়নি। শুধু জানে শাকিল চাকরিতে ব্যস্ত ঢাকায় কিন্তু কয়েকদিন যাবত মোবাইল বন্ধ পাচ্ছে। শাকিলের দেহটি মাটিতে গলে-পঁচে যাচ্ছে অথচ কেউ কিছু জানে না! রানা এই বাস্তবতার কাছে হার মানে। শাকিলের বন্ধু হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেয়। এই অবস্থাতে কিছু কথা মিথ্যা বলে। কারণ সে এমন সত্যের মুখোমুখি হয়নি কখনও। ছবির মানুষটিকে খুঁজে পেলে যেন রানা টাকা আর মানিব্যাগটা ফেরত দিতে পারে তাই শ্রাবন্তী ২৫ হাজার টাকা দিয়ে রাখে তাকে। টাকা গুলো শাকিলের বাবার হাতে তুলে দেয় রানা। কান্নার নোনা জলে নিজেকে পবিত্র করে নতুন ভাবে আবিষ্কার করে রানা। সব কিছু বলতে গিয়েও রানা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না। শুধু কুড়িয়ে পাওয়া মানিব্যাগটা শাকিলের স্ত্রীর হাতে দিয়ে জানায়, মানিব্যাগটা শাকিলের। দায়িত্ব নেয় শাকিলের পরিবারের। মুক্তি পায় অনুশোচনা থেকে।

গত ১২ই এপ্রিল এমনই এক গল্পে ইউটিউবে মুক্তি পায় বৈশাখের বিশেষ নাটক ‘মানিব্যাগটা কার?’। ওজন এন্টারটেইনমেন্ট প্রযোজিত তাদের নিজস্ব চ্যানেলে মুক্তি দেয় সন্ধ্যা ৬টা বাজে। কুদরত উল্লাহ’র গল্প ভাবনায় নির্মাণ করেন এ সময়ের জনপ্রিয় নির্মাতা মাবরুর রশীদ বান্নাহ। নাটকটির কাহিনী, সংলাপ ও চিত্রনাট্য তারই। এতে রানা চরিত্রে অভিনয় করেছেন অপূর্ব, শ্রাবন্তী চরিত্রে অভিনয় করেছেন উর্মিলা শ্রাবন্তী কর। রহস্যময় সেই শাকিলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন মুশফিক ফারহান। এছাড়াও আরও অনেকেই অভিনয় করেছেন। গেল সাত দিনেই আলোচনায় চলে আসে নাটকটি দর্শকের মাঝে। ইউটিউবে কমেন্টের ঝড় বইছে, বাড়ছে ভিও।

প্রায় ৮০ ভাগ মন্তব্যে দর্শক স্বীকার করেছেন, এই নাটকটি দেখার পর থেকে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একটি। কখনও কুড়িয়ে পাওয়া কোন কিছু নিজের কাছে রাখবেন না। জানার চেষ্টা করবেন সেটার মধ্যে লুকিয়ে থাকা গল্পটা। অনেকে আবার কেঁদেছেন এটা ভেবে যে, প্রতিদিন কত লাশ এভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হয়ে যায়। আমাদের একটু ভুল কিংবা লোভের জন্য কত বাস্তবতার আড়ালে ঘটতে থাকে আরও অনেক বাস্তবতার গল্প। আলোচনা চলতে থাকুক নাটকটি নিয়ে। আজ বিদায় নিচ্ছি আমি মহসিনা ফেরদৌস ডেনমার্ক থেকে। ততক্ষণে আপনারাও দেখে নিতে পারেন বিবেককে জাগিয়ে তোলার সত্য ঘটনার উপরে নির্মিত আলোচনায় আসা এই নাটকটি। সম্পূর্ণ নাটকটি দেখতে ক্লিক করুন নিচের ইউটিউব লিংকে।

https://www.youtube.com/watch?v=zHOjwLW-hvY&t=2293s